স্মৃতির পাতায় আমাদের দুর্গাপূজা

 

দুর্গাপূজা আমাদের কাছে শুধু একটি উৎসব নয়। ছোটবেলা থেকেই এটি ছিল বছরের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত, সবচেয়ে আনন্দের কয়েকটি দিনের একটি। পূজা আসতে তখনও অনেক দেরি, অথচ তার আগেই বন্ধুদের মধ্যে শুরু হয়ে যেত নানা আলোচনা—কার সঙ্গে পূজা দেখতে যাব, কোথায় যাব, কী করব, কোন দিন বেশি আনন্দ হবে। ছোট ছোট আবদারও থাকত। তার মধ্যে খেলনা পিস্তল ছিল অন্যতম। আগের বছরের পিস্তলটি যত্ন করে রেখে দিতাম, পূজার আগে সেটি আবার বের করে নেওয়ার মধ্যেও একটা আলাদা আনন্দ ছিল।

তবে ছোটবেলার দুর্গাপূজার সঙ্গে আনন্দের পাশাপাশি একটা অদ্ভুত উৎকণ্ঠাও জড়িয়ে আছে। পূজা কমিটি গঠনের সভা হবে, কিন্তু সেই সভা একবার পিছোচ্ছে, আবার পিছোচ্ছে—এটা আমাদের মতো ছোটদের কাছে তখন বেশ চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়াত। বড়রা হয়তো বিষয়টিকে সেভাবে দেখতেন না, কিন্তু পূজামণ্ডপটি আমাদের বাড়ির খুব কাছেই হওয়ায় এই অপেক্ষাটা হয়তো অন্যদের চেয়ে একটু বেশি অনুভব করতাম।

তবুও শেষ পর্যন্ত পূজা হয়েছে, আনন্দ হয়েছে। কমিটি গঠিত হওয়ার পর তো আমাদের উৎসাহের আর শেষ থাকত না। শুরু হয়ে যেত নানা আলোচনা। কে কী করবে, পুজোর প্রস্তুতি কেমন হবে, মণ্ডপ কেমন হবে—এসব নিয়েই আমাদের কল্পনার জগৎ তৈরি হতো।

পুজোর প্রস্তুতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অনেক ছোট ছোট স্মৃতির মধ্যে পাটশোলার কথাও মনে পড়ে। রোদে পাটশোলা শুকিয়ে রাখা হতো, আর সেটিই ছিল আমাদের কাছে পুজোর কাজ শুরু হওয়ার একটা পরিচিত দৃশ্য। আজও সেই সময়ের কথা মনে পড়লে সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। তখন এসব ছোট ছোট ঘটনাই বুঝিয়ে দিত—পুজো এগিয়ে আসছে।

সেই সময় বাসুগাঁওয়ের দুর্গাপূজায় মণ্ডপ নিয়ে আজকের মতো কোনো প্রতিযোগিতার পরিবেশ ছিল না। কে কার চেয়ে বড় বা সুন্দর মণ্ডপ করবে, কে পুরস্কার পাবে—এসব নিয়ে আমাদের বিশেষ ভাবনা ছিল না। আমরা যা পেতাম, সেটাই আনন্দ করে গ্রহণ করতাম। তবু মনের মধ্যে একটা ছোট্ট আশা থাকত—অন্তত একটা সুন্দর গেট যেন হয়!

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুজোর দায়িত্বও এক প্রজন্মের হাত থেকে অন্য প্রজন্মের হাতে যেতে লাগল। মণ্ডপের আকারও ধীরে ধীরে একটু একটু করে বড় হতে শুরু করল। সময়টা সম্ভবত ২০০০-এর দশক। তখনও আমি সরাসরি মণ্ডপ তৈরির কাজে যুক্ত ছিলাম না। তবে অন্যদের মতো আমরাও চাঁদা সংগ্রহ করতে বের হতাম। পাড়ার পুজোর সঙ্গে থাকার আনন্দটাই ছিল বড় কথা।

২০১০ সাল আমাদের পুজোর মণ্ডপের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য সময় হয়ে রইল। জয়ন্ত তালুকদার, বাপন শর্মা প্রমুখের উদ্যোগে ছন দিয়ে একটি মণ্ডপ তৈরির চেষ্টা শুরু হয়। তাঁদের সেই উদ্যোগ আমাদের মধ্যে নতুন আগ্রহ তৈরি করেছিল। আমি সেখানে যেতাম, কাজ দেখতাম এবং তাঁদের এই নতুন কিছু করার চেষ্টা ভালো লাগত। মনে হচ্ছিল, আমাদের পুজোও এবার একটু অন্যভাবে ভাবতে শুরু করেছে।

এর পরের বছর, ২০১১ সালে, পূজা কমিটি গঠনের সভার কয়েকদিন আগে আমি আমার আর্ট স্কুলে ছিলাম। সেখানে শিশুদের ছবি আঁকা শেখাতাম। সেদিন তাদের পদ্মফুল আঁকা শেখাতে গিয়ে হঠাৎ মনে হলো—এই পদ্মের পাপড়িগুলোর মধ্যেই যদি একটি প্রবেশপথের ভাবনা যোগ করা যায়, তাহলে এটিকে একটি মণ্ডপের রূপ দেওয়া যেতে পারে।



ভাবনাটা খুব সাধারণ ছিল। কিন্তু সেই সাধারণ ভাবনাটিই পরে আমাদের পুজোর একটি নতুন অধ্যায়ের শুরু হয়ে দাঁড়াল। পুজোর সভায় নকশাটি দেখানো হলো। সবার ভালো লাগল। অবশ্য নতুন ধরনের ভাবনা হওয়ায় কিছুটা সংশয়ও ছিল—কাগজে যে ভাবনাটি সুন্দর দেখাচ্ছে, বাস্তবে সেটি কেমন হবে?

আমাদের বন্ধু সত্যম সূত্রধরও প্রথমে কিছুটা দ্বিধায় ছিল। জয়ন্ত ও আমি অন্য একজনের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সত্যমও পরিকল্পনাটি গ্রহণ করল।

তারপর শুরু হলো কাজ।

কাগজে আঁকা সেই পদ্মের ভাবনাটিকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সহজ ছিল না। অনেক চেষ্টা, পরিশ্রম, আলোচনা এবং সবার সহযোগিতায় ধীরে ধীরে মণ্ডপটি তৈরি হতে লাগল। বিলাসীপাড়া থেকে কাপড় আনা হলো। একে একে পদ্মের পাপড়িগুলো বাস্তব রূপ পেতে লাগল। শেষ পর্যন্ত যখন মণ্ডপটি সম্পূর্ণ হলো, তখন আমাদের আনন্দের সীমা ছিল না।

২০১১ সালের সেই পদ্মের মণ্ডপটি আমাদের জন্য শুধু একটি মণ্ডপ ছিল না; এটি ছিল নতুন কিছু করার সাহসের শুরু।

বাসুগাঁওয়ের মানুষও মণ্ডপটি ভালোভাবে গ্রহণ করেছিলেন। আমাদের পুজোতেও যে নিজেদের ভাবনা থেকে নতুন কিছু করা সম্ভব—সেই বিশ্বাসটা তখন তৈরি হলো। আর সেই বিশ্বাসই পরবর্তী বছরগুলিতে আরও নতুন কিছু করার সাহস দিয়েছিল।


পরের বছর, ২০১২ সালে, এলাকার অস্থির পরিস্থিতির কারণে মণ্ডপ তুলনামূলকভাবে সাধারণভাবেই করতে হয়েছিল। কিন্তু ২০১৩ সাল থেকে মানুষের প্রত্যাশা যেন একটু বেড়ে গেল। আমাদের কাছ থেকেও সবাই নতুন কিছু দেখতে চাইতে শুরু করলেন।




 




আমরাও তখন ভাবতে শুরু করলাম—কোনো বিখ্যাত স্থাপত্য বা পরিচিত কোনো স্থানের অনুকরণ না করে সম্পূর্ণ নতুন কিছু করা যায় কি না। সেই ভাবনা থেকেই এল তিনটি সিংহকে কেন্দ্র করে একটি মন্দিরের মতো কাঠামো। তখন কম্পিউটারে নকশা করারও চেষ্টা করা হয়েছিল।

আমাদের সামনে তখন অনেক সীমাবদ্ধতা। অর্থের সীমাবদ্ধতা ছিল, উপকরণ সম্পর্কেও অভিজ্ঞতা খুব বেশি ছিল না। কিন্তু নতুন কিছু করার ইচ্ছাটা ছিল প্রবল। কীভাবে কাজটি করা যায়, কোন উপকরণ ব্যবহার করলে কাঙ্ক্ষিত রূপ পাওয়া যাবে—এসব নিয়ে চলত নানা আলোচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা।

সেই সময় জয়ন্ত নতুন একটি উপকরণ নিয়ে কাজ করার কথা বলল। সেটি আমাদের কাছে ছিল একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা। সেই উপকরণকে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে আমরা মণ্ডপের কাঙ্ক্ষিত রূপ দিতে শুরু করলাম। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও নতুন কিছু করার এই প্রচেষ্টাই আমাদের আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল।

এই কাজগুলোতে কারও একার কৃতিত্ব ছিল না। কেউ পরিকল্পনা করেছে, কেউ কাঠামোর কাজে যুক্ত হয়েছে, কেউ কাপড় লাগিয়েছে, কেউ রং করেছে, কেউ উপকরণ সংগ্রহ করেছে, কেউ চাঁদা তুলেছে। পাড়ার মানুষের সহযোগিতা আর সকলের পরিশ্রম—সবকিছু মিলিয়েই মণ্ডপগুলো ধীরে ধীরে রূপ পেয়েছে।

তারপর এল আমাদের পুজোর জন্য একেবারে অন্যরকম একটি বছর—একটি বিশাল শিবমূর্তির পরিকল্পনা।

আগের মণ্ডপগুলোর অভিজ্ঞতা থেকেই এবার আমাদের মনে হলো, আরও বড় পরিসরে কিছু করা যায়। ভাবনাটা ছিল একটি বিশাল শিবমূর্তি তৈরি করা। কিন্তু ভাবনা যত সহজ মনে হয়েছিল, বাস্তবে কাজটি ছিল ততটাই কঠিন। এত বড় একটি প্রতিরূপ কীভাবে তৈরি হবে, তা নিয়ে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন ছিল। আমাদের অভিজ্ঞতা সীমিত, সামর্থ্যও সীমিত—তবুও আগের কাজগুলোর অভিজ্ঞতা এবং মানুষের উৎসাহ আমাদের সাহস দিয়েছিল।



তারপর শুরু হলো একটানা পরিশ্রম। প্রায় এক মাস ধরে মণ্ডপের কাজ চলল। সেই সময় পুজোর আগে আমাদের অনেকের জীবনের একটা বড় অংশ যেন মণ্ডপের সঙ্গেই জড়িয়ে গিয়েছিল। কাজের মধ্যে ক্লান্তি ছিল, চিন্তা ছিল, কখনও কোনো কিছু ঠিকমতো হবে কি না সেই সংশয়ও ছিল। কিন্তু কাজ থামেনি।

এই মণ্ডপের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি ছোট্ট অথচ আজও মনে থাকার মতো ঘটনা।

একদিন কাজের ফাঁকে দেখি, একটি ছোট ছেলে তার বন্ধুদের সঙ্গে আমাদের তৈরি শিবমূর্তি নিয়ে আলোচনা করছে। আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে তাদের কথা শুনছিলাম। ছেলেটি নিজের আঙুল দেখিয়ে বন্ধুদের বোঝাচ্ছিল—তারা নিজেদের নাকে যে আঙুল ঢোকাতে পারে, আমাদের তৈরি শিবের নাকের ছিদ্রে সেই আঙুল ঢোকানো যাবে না!

কথাটা শুনে আমি একেবারে থমকে গেলাম। কারণ শিবের মুখের এতটা ওপরে আমি নিজেই পৌঁছতে পারছিলাম না। তখনই মনে হলো, ছেলেটির কথায় কিন্তু একটা বাস্তব সমস্যা ধরা পড়েছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে জয়ন্তের কাছে ছুটে গিয়ে ঘটনাটা বললাম। জয়ন্তও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিল, এবং সেই অনুযায়ী কাজটি সংশোধন করা হলো।

আজ সেই শিশুটি আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু তার সেই ছোট্ট মন্তব্যটি আজও মনে পড়ে। আমাদের কাজের জন্য পরামর্শ সবসময় বড়দের কাছ থেকেই আসবে—এমন কোনো কথা নেই। কখনও কখনও একটি শিশুর সরল পর্যবেক্ষণও আমাদের কাজকে আরও ভালো করে দিতে পারে। সেই সময় থেকেই হয়তো আরও ভালোভাবে বুঝেছিলাম—এই পুজো আসলে সবার। যে যার জায়গা থেকে, যে যতটুকু পারে, তার ভাবনা নিয়ে এই কাজে যুক্ত হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত যখন সেই বিশাল শিবমূর্তি সম্পূর্ণ হয়ে দাঁড়াল, তখন নিজেদের চোখেই যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না—এত বড় একটি কাজ আমরা সত্যিই শেষ করতে পেরেছি! পুজোর দিন মানুষের ভিড়, তাঁদের আগ্রহ এবং মূর্তিটি দেখে তাঁদের আনন্দ আমাদের সমস্ত পরিশ্রমকে সার্থক করে দিয়েছিল।

আজ এত বছর পরে সেই সময়ের কথা ভাবলে মনে হয়, তখন আমরা কীভাবে এত বড় একটি প্রতিরূপ তৈরি করার সাহস পেয়েছিলাম, সেটাই অবাক করে। আজকের সুযোগ-সুবিধা, প্রযুক্তি ও উপকরণের কথা ভাবলে সেই সময়ের কাজকে আরও কঠিন বলে মনে হয়।

কিন্তু সেই সময় আমাদের একটা বড় শক্তি ছিল—মানুষের বিশ্বাস।

নতুন ভাবনার পথে

২০১৫ সালে আমরা আগের বছরের শিবমূর্তির মাথাটিকে ব্যবহার করে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ভাবনা নিয়ে এগোলাম। একটি পুরনো ধূসর পাথরের মন্দিরের আদলে মণ্ডপটি তৈরি করা হয়েছিল। পরে একটি সংবাদপত্রে সেটিকে ইন্দোনেশিয়ার হিন্দু মন্দিরের প্রতিরূপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই মন্দিরকে অনুসরণ করে আমরা নকশাটি তৈরি করিনি। আমাদের ভাবনাটি ছিল নিজস্ব, এবং সেই সময় আমরা নিজেরাই বিভিন্নভাবে একটি নতুন রূপ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম।










এই মণ্ডপটির আরেকটি সুন্দর দিক ছিল শিশুদের অংশগ্রহণ। মণ্ডপের শিল্পভাবনার সঙ্গে মিল রেখে অনেক শিশু সেখানে নিজেদের আঁকা ছবি ও শিল্পকর্ম দিয়ে অংশ নিয়েছিল। ঘাস, ঝোপঝাড়সহ নানা প্রাকৃতিক উপাদানও তাদের আঁকা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে মণ্ডপের অংশ হয়ে উঠেছিল। ফলে মণ্ডপটি শুধু আমাদের কাজ হয়ে থাকেনি; অনেক ছোট ছোট শিল্পীরও সেখানে নিজেদের প্রকাশের সুযোগ হয়েছিল।

২০১৫ এবং তার পরের দুই বছর আমাদের জন্য বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে। 

২০১৬ সালে আমার কর্মজীবনেও কিছুটা পরিবর্তন এল। এর আগে বাসুগাঁওয়ের কাছাকাছি একটি হাইস্কুলে চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক হিসেবে কাজ করতাম। তাই পুজোর সময় মণ্ডপের কাজে প্রায় প্রতিদিনই থাকতে পারতাম। কিন্তু সেই বছর গোলকগঞ্জে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর আগের মতো প্রতিদিন বাসুগাঁওয়ে এসে মণ্ডপের কাজে সময় দেওয়া আর সম্ভব হচ্ছিল না। আগের মতো সবার সঙ্গে থেকে কাজ করতে না পারায় কিছুটা খারাপ লাগছিল। তাই এবার কাজের ধরনটা একটু বদলানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। মণ্ডপের পরিকল্পনা ও নকশা তৈরি করলাম, বিভিন্ন অংশের মাপ দিয়ে দিলাম এবং নিজের হাতে করার কাজটা যতটা সম্ভব কম রাখলাম। উত্তম সূত্রধর, যিনি এই কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন, সেই নকশা ও মাপ অনুসরণ করে UFO-র আদলে মণ্ডপটির কাঠামো তৈরি করলেন। এভাবে দূরে থেকেও কাজটির সঙ্গে যুক্ত থাকা সম্ভব হলো।





রাতের আলোয় মণ্ডপটি দেখতে সত্যিই অন্যরকম লাগত। আলো-ছায়ার ব্যবহারে মনে হতো যেন একটি UFO আকাশে ভাসছে। দিনের বেলায় অবশ্য কাঠামোটির কিছুটা খসখসে ভাব চোখে পড়ত, কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্যই ছিল প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে নতুন কিছু করার চেষ্টা করা। আর সেই চেষ্টার স্বীকৃতি হিসেবে যখন News Live Assam-এর বিচারে মণ্ডপটি অসমের সেরা পাঁচটি মণ্ডপের মধ্যে নির্বাচিত হলো এবং পুরস্কৃত হলাম, তখন স্বাভাবিকভাবেই আমাদের সবার মধ্যে একটা আলাদা আনন্দ তৈরি হয়েছিল।


২০১৭ সালে তৈরি করেছিলাম আমাদের অন্যতম জনপ্রিয় মণ্ডপ—মঙ্গলযান। আগের বছরের UFO মণ্ডপের সাফল্যের পর এবারও আমি নকশাটি তৈরি করলাম। মণ্ডপটি অনেক উঁচু হবে বলে কাজটি কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে—এই আশঙ্কা থাকলেও সবাই পরিকল্পনাটিতে রাজি হলো। কাঠামোর বাঁশের কাজের জন্য পেশাদার লোক আনা হলো, আর উত্তম মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে প্লাইউডের অংশটি তৈরি করে ফেলল। 







মঙ্গলযানের উজ্জ্বল, ধোঁয়াটে আবহ তৈরি করতে তুলা লাগানোর জন্য প্রচুর ডেনড্রাইট আঠা ব্যবহার করা হলো। একসময় বাসুগাঁওয়ে আঠা প্রায় শেষ হয়ে গেল, আর আমরা বঙাইগাঁও যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ঠিক তখনই একজন লোক এসে জানালেন, তাঁর কাছে অল্প ব্যবহৃত ডেনড্রাইটের একটি বড় বালতি আছে, প্রয়োজন হলে তিনি সেটি আমাদের কম দামে দিয়ে দেবেন। সেই মুহূর্তে ব্যাপারটা সত্যিই বেশ স্বস্তির ছিল। 

এরপর এল মণ্ডপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় কাজগুলোর একটি—রং করা। মঙ্গলযানে এই প্রথম আমি স্প্রে গান দিয়ে রং করার চেষ্টা করলাম। কাজে অনেকেই সাহায্য করেছিল। মণ্ডপটি এত বড় ছিল যে কাছে উঠে কাজ করার সময় নিজের রং করা ঠিকমতো দেখতেই পারতাম না। তাই মাঝে মাঝে নেমে একটু দূর থেকে কাজটা দেখতাম, আবার স্প্রে গান নিয়ে উঠে পড়তাম। অনেকে আবার মোবাইলে তোলা বিভিন্ন সময়ের ছবি ও ভিডিও দেখিয়ে সাহায্য করত। এতসবের মধ্যেও মঙ্গলযানের রংয়ের কাজটি বেশ ভালোভাবেই সম্পন্ন হয়েছিল। মণ্ডপ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই এর একটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছিল এবং মানুষের মধ্যে বেশ আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। সেই বছর বৃষ্টিও মানুষের উৎসাহ কমাতে পারেনি; বৃষ্টি উপেক্ষা করেও অনেক মানুষ আমাদের মণ্ডপ দেখতে এসেছিলেন। আবারও News Live Assam-এর নির্বাচনে আমাদের মণ্ডপ স্থান পায় এবং পুরস্কৃত হয়।

 


















এর পরের বছর আবার এল সম্পূর্ণ অন্যরকম একটি পরীক্ষা—চলন্ত পৃথিবী।

পৃথিবী নিজের অক্ষের চারদিকে ঘুরছে—এই ভাবনাটিকে মণ্ডপের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলাম আমরা। এত বড় একটি কাঠামোকে চলমান করা ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ। শুধু মণ্ডপ তৈরি করাই নয়, সেটিকে নড়াচড়া করানো—পুরো ব্যাপারটাই ছিল আমাদের জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ।

তবুও আমরা চেষ্টা করেছিলাম। অনেক পরিশ্রমের পর বড় কাঠামোটিকে ঘোরানোর ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছিল। যদিও সময়ের অভাব এবং বৃষ্টির কারণে শেষ পর্যন্ত কাজটি আমাদের প্রত্যাশামতো সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি। অসম্পূর্ণতার সেই কষ্টও ছিল, আবার এতটা কঠিন একটি কাজ করার অভিজ্ঞতাও ছিল। 

তারপর থেকে পথটা আর থামেনি।

আজও আমরা নিজেদের মতো করে মণ্ডপ তৈরি করে চলেছি। অবশ্য প্রতিবার আমাদের মনের মতো বা মানুষের প্রত্যাশামতো মণ্ডপ তৈরি করতে পারি না। কখনও সময় কম পড়ে, কখনও অর্থের সমস্যা হয়, কখনও আবহাওয়া বাধা হয়ে দাঁড়ায়, কখনও নিজেদের সীমাবদ্ধতাই সামনে এসে যায়। কখনও কখনও কাজ করতে গিয়ে রাতের পর রাত ঘুম হয় না।

সময় বদলেছে। মানুষের ব্যস্ততাও বেড়েছে। আগের মতো সবাইকে সবসময় পাওয়া যায় না। তবুও যখন কাজ শুরু হয়, তখন আজও অনেকেই নিজের কাজের ফাঁকে স্বেচ্ছায় এসে পাশে দাঁড়ান। কেউ বেশি সময় দিতে পারেন, কেউ কম; কেউ প্রতিদিন আসেন, কেউ সুযোগ পেলেই আসেন। কিন্তু এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণটাই আমাদের কাছে অনেক বড় পাওয়া।

আমরা এটাও বুঝি যে প্রতিবার সফল হওয়া সম্ভব নয়। কোনো বছর মণ্ডপ খুব ভালো হয়, কোনো বছর প্রত্যাশামতো হয় না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, আমাদের মানুষ কখনও শুধু একটি ব্যর্থতার কারণে আমাদের ওপর বিশ্বাস হারাননি। তাঁরা জানেন, আমরা চেষ্টা করি। আর তাঁদের সেই বিশ্বাসই আমাদের আবার শুরু করার শক্তি দেয়।

তবে একটি বিষয় নিয়ে আমার ব্যক্তিগতভাবে সবসময় একটা দ্বিমত আছে। কখনও কখনও মনে হয়, শুধু ‘থিম মণ্ডপ’কে বড় করে দেখাতে গিয়ে যেন দুর্গাপূজার আসল মূল্যবোধটি আড়ালে না চলে যায়। মণ্ডপ আমাদের পুজোর একটি অংশ, কিন্তু পুজো শুধুমাত্র মণ্ডপ নয়।

আমরা কোনো পেশাদার দলকে বিপুল অর্থ দিয়ে মণ্ডপ তৈরি করিয়ে নিই না। আমাদের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেই আমরা নিজেরা ভাবি, চেষ্টা করি, ভুল করি, আবার ঠিক করি। সেই প্রক্রিয়াটাই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের থিম কোনো পুরস্কার পাওয়ার জন্য নয়, শুধু মানুষকে আকর্ষণ করার জন্যও নয়। এর সঙ্গে আমাদের কাছে জড়িয়ে আছে দেবী দুর্গার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও ভক্তি।

মণ্ডপ তৈরি করতে গিয়ে আমরা একসঙ্গে কাজ করি। সেখানে বয়সের পার্থক্য থাকে না, কে কী করেন তার পার্থক্য থাকে না, ব্যক্তিগত দূরত্বও ধীরে ধীরে কমে আসে। যে মানুষটির সঙ্গে হয়তো সারা বছর খুব বেশি কথা হয় না, পুজোর কাজে এসে তার সঙ্গেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করা হয়। এই একসঙ্গে কাজ করার মধ্যেই একটা অন্যরকম সম্পর্ক তৈরি হয়।

আর যারা নিঃস্বার্থভাবে এই কাজে নিজেদের সময় ও শ্রম দেয়, তাদের মধ্যেও তৈরি হয় আত্মবিশ্বাস। নিজের হাতে কিছু তৈরি করার আনন্দ, কোনো কঠিন কাজকে একসঙ্গে সম্পূর্ণ করার অভিজ্ঞতা—এসব হয়তো কোনো পুরস্কারের চেয়েও বড় প্রাপ্তি।

আজ যখন আমাদের দুর্গাপূজা সুবর্ণজয়ন্তীর দোরগোড়ায়, তখন পেছনে ফিরে তাকালে আসলে কোনো একটি মণ্ডপ, কোনো একটি বছর, কোনো একটি পুরস্কারের কথা আলাদা করে মনে পড়ে না। মনে পড়ে অনেক মুখ। মনে পড়ে ছোটবেলার সেই অপেক্ষা, পূজা কমিটি গঠনের উৎকণ্ঠা, পাটশোলার দিন, চাঁদা সংগ্রহের দিন, রাত জেগে কাজ করা, ভুল হওয়া, আবার ঠিক করা, নতুন ভাবনা নিয়ে আলোচনা, শিশুদের কৌতূহল, বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা, আর সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে—একসঙ্গে কিছু করার আনন্দ।

এই দীর্ঘ পথচলায় আমরা হয়তো সবসময় সফল হইনি। সব মণ্ডপ হয়তো আমাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। কিন্তু প্রতিটি মণ্ডপ আমাদের কিছু না কিছু শিখিয়েছে। কোনোটি শিখিয়েছে নতুন করে ভাবতে, কোনোটি শিখিয়েছে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও চেষ্টা করতে, কোনোটি শিখিয়েছে ব্যর্থতার পরেও আবার শুরু করতে। আর প্রতিটি বছরই আমাদের আরও একটু কাছাকাছি এনেছে।

শেষ পর্যন্ত তাই এই মণ্ডপগুলোর গল্প আমার বা কারও একার গল্প নয়। এটি আমাদের Thanaroad Thuribari দুর্গাপূজার গল্প—আমাদের বাসুগাঁওয়ের মানুষের গল্প।

যে পুজো আমাদের শৈশবের আনন্দ দিয়েছে, বড় হতে শিখিয়েছে, একসঙ্গে কাজ করতে শিখিয়েছে এবং নানা পার্থক্য ভুলে এক জায়গায় দাঁড়াতে শিখিয়েছে—সেই পুজোর কাছে আমাদের ঋণ অনেক।

পঞ্চাশ বছরের এই পথচলা তাই শুধু সময়ের হিসাব নয়; এটি অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা, শ্রম, স্মৃতি ও বিশ্বাসের সমষ্টি।

আর সেই বিশ্বাস নিয়েই আমাদের পথচলা এখনও অব্যাহত।

স্মৃতির পথ পেরিয়ে, নতুন স্বপ্নের দিকে—আমাদের দুর্গাপূজা এগিয়ে চলুক।

Comments

Popular posts from this blog

Using the Right Words in the Right Place: A Guide for English Learners

Elevate Your English: Mastering Advanced Vocabulary

The Importance of Setting Boundaries in Friendships: Why Loving Excessively Can Be Harmful